সংবিধান পাঠ 2

 সংবিধান পাঠ

 দ্বিতীয় পর্ব

    "We, the People of India" — মাত্র চারটি শব্দ, অথচ গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি ভারতের সংবিধানের প্রথম লাইনটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত, কিন্তু সবচেয়ে কম বোঝা একটি বাক্য— "We, the People of India"। মজার ব্যাপার হলো, আমরা এই চারটি শব্দ এত বেশি শুনেছি যে, এর গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক তাৎপর্য নিয়ে ভাবার প্রয়োজনই বোধ করি না।
    আমাদের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি কথা খুব প্রচলিত— "সরকার আমাদের এই অধিকার দিয়েছে", "অমুক প্রধানমন্ত্রী এই অধিকার দিয়েছেন", "অমুক দল এসে আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে" ইত্যাদি। এই কথাগুলো শুনলে আমার বেশ মজা লাগে। কারণ ভারতের সংবিধানের প্রথম চারটি শব্দই এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে দেয়।
 
    একটু ভেবে দেখুন তো, সংবিধান যদি শুরু হতো— "We, the Parliament of India..." অথবা "We, the Government of India..." তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াত? তার অর্থ হতো, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য কিছু অধিকার ও কিছু সুবিধা প্রদান করছে। অর্থাৎ ক্ষমতার উৎস হতো রাষ্ট্র।
 
    কিন্তু ভারতীয় সংবিধান সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেছে। সংবিধান বলছে, "আমরা, ভারতের জনগণ, এই সংবিধান নিজেদের জন্য নিজেরাই গ্রহণ করছি।" অর্থাৎ, ক্ষমতার উৎস রাষ্ট্র নয়। ক্ষমতার উৎস জনগণ। এবার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলা দরকার। আমাদের দেশে অনেকেই মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি। কেউ কেউ আবার মনে করেন, সংসদই সর্বেসর্বা। আইন পড়ুয়াদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন সুপ্রিম কোর্টই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসাংবিধানিকভাবে এই তিনটি বক্তব্যই ভুল।
ভারতে সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠান কোনটি?
উত্তর হলো— কোনো প্রতিষ্ঠানই নয়।
    ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ। সংসদ জনগণের প্রতিনিধি মাত্র। সরকার জনগণের কর্মচারী মাত্র। বিচার বিভাগ সংবিধানের অভিভাবক মাত্র। রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রধান মাত্র। এদের কারোরই নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। জনগণ সংবিধানের মাধ্যমে যে ক্ষমতা প্রদান করেছেন, তারা কেবল সেই ক্ষমতাটুকুই প্রয়োগ করতে পারেন।
    এই বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, আপনি আপনার বাড়ি দেখাশোনার জন্য একজন ম্যানেজার নিয়োগ করলেন। সেই ম্যানেজারের অনেক ক্ষমতা থাকতে পারে— তিনি কর্মচারী নিয়োগ করতে পারেন, খরচের হিসাব রাখতে পারেন, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু তিনি কি বাড়িটির মালিক? নিশ্চয়ই নন। তিনি কেবল আপনার দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।
    ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাটিও অনেকটা সেরকম। জনগণই প্রকৃত মালিক। রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠান জনগণের দেওয়া ক্ষমতার প্রয়োগকারী মাত্র। এবার আরেকটি প্রশ্ন করা যাক। আমরা কি সত্যিই স্বাধীন দেশের নাগরিক? বেশিরভাগ মানুষ বলবেন, অবশ্যই। কারণ ১৯৪৭ সালে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আসলে সাংবিধানিকভাবে আমরা ১৯৪৭ সালে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হইনি। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে, কিন্তু নিজেদের সংবিধানের মাধ্যমে নিজেদের শাসন করার অধিকার কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে। সেই দিন থেকেই ভারতের জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রকে সাংবিধানিকভাবে গ্রহণ করেছেন।
    এই কারণেই ২৬ জানুয়ারির গুরুত্ব শুধুমাত্র একটি জাতীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সেই দিন, যেদিন রাষ্ট্র জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জবাবদিহি হতে শুরু করে। আরেকটি বিষয় আমাদের বোঝা জরুরি। "We, the People of India" কথাটি কখনোই "We, the Majority of India" বলা হয়নি। সংবিধান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কথা বলেনি। এটি ভারতের সমস্ত জনগণের কথা বলেছে। আপনি যে ধর্মেরই হোন, যে ভাষায় কথা বলুন, যে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করুন কিংবা আদৌ কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস না করুন— সংবিধানের চোখে আপনি সমান মর্যাদার একজন নাগরিক।
    এই চারটি শব্দের মধ্যেই ভারতের সাংবিধানিক দর্শনের সবচেয়ে বড় ঘোষণা লুকিয়ে আছে— রাষ্ট্র নাগরিক সৃষ্টি করে না, নাগরিক রাষ্ট্র সৃষ্টি করে। তাই যখনই কোনো সরকার নিজেদের দেশের মালিক বলে ভাবতে শুরু করে, তখন সংবিধানের প্রথম লাইনটি আবার পড়ে নেওয়া উচিত। যখন কোনো রাজনৈতিক দল নিজেদের দেশপ্রেমের একমাত্র ঠিকাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখনও সংবিধানের প্রথম লাইনটি পড়া উচিত। এমনকি যখন আমরা নিজেরাই ভুলে যাই যে আমরা এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার, তখনও সংবিধানের প্রথম লাইনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— এই রাষ্ট্র আমাদের।
    আমরা সরকারের প্রজা নই, আমরা রাষ্ট্রের মালিকও নই; আমরা একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক। আর সেই কারণেই ভারতের সংবিধানের সবচেয়ে বিপ্লবী রাজনৈতিক ঘোষণা কোনো দীর্ঘ অনুচ্ছেদ নয়, মাত্র চারটি শব্দ— "We, the People of India."
এই চারটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভারতীয় গণতন্ত্রের আত্মা।

মন্তব্যসমূহ