সংবিধান পাঠ ৩
সংবিধান পাঠ
তৃতীয় পর্ব
ভারত কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র? গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক অর্থ কী? আমাদের দেশে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত চারটি রাজনৈতিক শব্দ হলো— গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চারটি শব্দ ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে আক্রমণ করে, সংবাদমাধ্যম রাতভর বিতর্ক চালায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ তর্কে জড়িয়ে পড়েন, অথচ সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব কম মানুষই জানেন যে সংবিধানের ভাষায় এই শব্দগুলোর অর্থ আসলে কী।
আরও মজার বিষয় হলো, এই চারটি শব্দের মধ্যে দুটো আবার ভারতের মূল সংবিধানেই ছিল না! হ্যাঁ, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হওয়া ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় "Socialist" এবং "Secular" শব্দ দুটি ছিল না। এগুলো পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত করা হয়। এখানেই সংবিধান সম্পর্কে আরেকটি ভুল ধারণা ভেঙে যায়। সংবিধান কোনো পাথরে খোদাই করা দলিল নয়। সময়ের প্রয়োজনে সংবিধান পরিবর্তিত হতে পারে, নতুন ধারণাকে গ্রহণ করতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনেরও সাংবিধানিক সীমারেখা রয়েছে।
এবার আসা যাক শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থে।
গণতন্ত্র (Democracy): সাধারণতঃ আমাদের দেশে গণতন্ত্রকে ভোট দেওয়ার অধিকার বলেই মনে করা হয়। পাঁচ বছর অন্তর ভোট দিলাম, সরকার নির্বাচন করলাম, ব্যস! গণতন্ত্র শেষ। আসলে ভোট গণতন্ত্রের একটি অংশ মাত্র, গণতন্ত্র নয়।
একটি রাষ্ট্রে যদি নির্বাচন হয় কিন্তু সংবাদমাধ্যম স্বাধীন না থাকে, বিচার বিভাগ সরকারের চাপে কাজ করে, বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ না থাকে, রাষ্ট্র ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিক অধিকার খর্ব করে— তাহলে সেই রাষ্ট্রে নির্বাচন থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র নাও থাকতে পারে।
ভারতীয় সংবিধানের দৃষ্টিতে গণতন্ত্রের অর্থ হলো— জনগণের অংশগ্রহণ, সাংবিধানিক শাসন, আইনের শাসন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকের স্বাধীনতার সহাবস্থান।গণতন্ত্র কখনোই শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের নাম নয়। বরং গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত এবং সংখ্যালঘুর অধিকার— এই দুইয়ের মধ্যে সাংবিধানিক ভারসাম্যের নাম।
প্রজাতন্ত্র (Republic) এই শব্দটি নিয়ে আমাদের দেশে খুব কম আলোচনা হয়। অনেকেই জানেন না যে, গণতন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্র এক জিনিস নয়। যুক্তরাজ্য (UK) একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, কিন্তু প্রজাতন্ত্র নয়। কারণ সেখানে রাষ্ট্রপ্রধান একজন বংশানুক্রমিক রাজা বা রানি। ভারত একটি প্রজাতন্ত্র। অর্থাৎ, এই রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি জন্মসূত্রে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার অধিকার রাখেন না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদও জনগণের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। একজন কৃষকের সন্তান যেমন রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, তেমনই একজন চা বিক্রেতার সন্তান প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। অন্তত সাংবিধানিকভাবে সেই পথ সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় দর্শন হলো— রাষ্ট্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি জনগণের যৌথ মালিকানাধীন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।
সমাজতন্ত্র (Socialist) এটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ভুল ব্যাখ্যা করা একটি শব্দ। সংবিধানে "Socialist" লেখা আছে মানেই যে ভারত একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি অনুসরণ করবে, বিষয়টি মোটেও তা নয়। ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির পথে হাঁটেনি, আবার সম্পূর্ণ অবাধ পুঁজিবাদী অর্থনীতিও গ্রহণ করেনি।
ভারতীয় সাংবিধানিক সমাজতন্ত্রের অর্থ হলো— সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। রাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে যেখানে সুযোগের সাম্য থাকবে এবং সমাজের দুর্বলতম মানুষটিও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ, সমাজতন্ত্র এখানে একটি অর্থনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে অনেক বেশি একটি সাংবিধানিক অঙ্গীকার।
ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism) সম্ভবত ভারতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত শব্দ এটি। আমাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার দুটো জনপ্রিয় সংজ্ঞা রয়েছে। একদল বলেন, এর অর্থ রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকবে না। অন্যদল বলেন, এর অর্থ সব ধর্মকে সমান সম্মান করা। দুটি ব্যাখ্যার মধ্যেই আংশিক সত্য রয়েছে। ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতার অনুকরণ নয়। ফ্রান্সে রাষ্ট্র এবং ধর্মের মধ্যে একটি কঠোর প্রাচীর রয়েছে। ভারতের মডেলটি ভিন্ন।
ভারতীয় সংবিধান রাষ্ট্রকে ধর্মবিরোধী হতে বলেনি। আবার রাষ্ট্রকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হতেও বলেনি। সংবিধান রাষ্ট্রকে বলেছে— তুমি নাগরিককে তার ধর্মের ভিত্তিতে বিচার করতে পারবে না। রাষ্ট্রের চোখে একজন হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ কিংবা নাস্তিক নাগরিকের সাংবিধানিক মর্যাদা সম্পূর্ণ সমান।
শেষ কথা
আমরা এই শব্দগুলোকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করেছি। "গণতন্ত্র বাঁচাও", "ধর্মনিরপেক্ষতা বাঁচাও", "সংবিধান বাঁচাও"— এসব স্লোগান আমরা প্রায় প্রতিদিনই শুনি। কিন্তু যে বিষয়টি খুব কমই শুনি তা হলো— "সংবিধানটা একটু পড়ে দেখি।" কারণ সংবিধান আবেগ দিয়ে বোঝা যায় না। সংবিধানকে জানতে হয়, পড়তে হয়, তার দর্শনকে উপলব্ধি করতে হয়। গণতন্ত্র মানে ভোট নয়, প্রজাতন্ত্র মানে শুধু রাষ্ট্রপতি নয়, সমাজতন্ত্র মানে কমিউনিজম নয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। এই চারটি শব্দ মিলে ভারত রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করেছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, এই শব্দগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এগুলো ভারতের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক পরিচয়।
আমরা ভারতীয়। আর সেই পরিচয়ের সাংবিধানিক ভাষাই হলো— Sovereign, Socialist, Secular, Democratic Republic।
চলবে.....
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন